কল্পনা করুন, পূর্ব এশিয়ার একজন রোগী ক্লিনিকে এসেছেন যার মাইক্রোসাইটিক এরিথ্রোসাইটোসিস রয়েছে—অর্থাৎ লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা অনেক বেশি, কিন্তু কোষগুলো আকারে খুব ছোট। আপাতদৃষ্টিতে এটি পলিসাইথেমিয়া ভেরা (PV) বলে মনে হতে পারে, যা একটি গুরুতর রক্তজনিত ক্যানসার সদৃশ অবস্থা এবং রক্ত পাতলা করার জন্য বারবার ফ্লেবোটমি করার প্রয়োজন হয়। তবে ভুল রোগ নির্ণয় করলে রোগীর অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। ২০২৫ সালের একটি চমকপ্রদ কেস স্টাডিতে তাইওয়ানের একটি শীর্ষস্থানীয় মেডিকেল সেন্টারের হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ ড. হুই-লিং লিউ (Hui-Ling Liu, MD) এবং ড. ওয়েই-টিং হুয়াং (Wei-Ting Huang, MD) সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য ট্রায়ো-ভিত্তিক হোল এক্সোম সিকোয়েন্সিং (WES) পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তাদের এই গবেষণাপত্রটি বিখ্যাত অ্যানালস অফ হেমাটোলজি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যা PV-এর সম্ভাবনা নাকচ করে হিমোগ্লোবিন সুরেসনেস (Hb Suresnes) এবং আলফা-জিরো-থ্যালাসেমিয়ার একটি বিরল জেনেটিক সংমিশ্রণ উন্মোচন করেছে।
মাইক্রোসাইটিক এরিথ্রোসাইটোসিস নির্ণয় করা মোটেও সহজ কাজ নয়। সাধারণত পলিসাইথেমিয়া ভেরা রোগে স্বাভাবিক বা বড় আকারের লোহিত রক্তকণিকা এবং JAK2 মিউটেশন দেখা যায়। কিন্তু থ্যালাসেমিয়ার মতো হিমোগ্লোবিনোপ্যাথিগুলো ছোট লোহিত রক্তকণিকার অতিরিক্ত উৎপাদনের মাধ্যমে এই রোগের লক্ষণগুলোকে নকল করতে পারে। এই রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণ সিবিসি বা হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষাগুলো সঠিক ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। মলিকুলার হেমাটোলজিতে দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ড. লিউ এবং ড. হুয়াং জানতেন যে, এই রহস্য সমাধানের জন্য আণবিক স্তরের প্রমাণ অপরিহার্য।
এই রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব এবং এর বাস্তব ঝুঁকি অপরিসীম। যদি ভুলবশত রোগীকে PV আক্রান্ত মনে করে ফ্লেবোটমি করা হতো, তবে তা থ্যালাসেমিয়া-জনিত রক্তস্বল্পতাকে আরও ভয়াবহ করে তুলত। পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটিই প্রথম রিপোর্ট করা হিমোগ্লোবিন সুরেসনেস এবং আলফা-থ্যালাসেমিয়ার সংমিশ্রণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব এশিয়ায় আলফা-থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব ৫-১০ শতাংশ হলেও হিমোগ্লোবিন সুরেসনেস মূলত ইউরোপীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। হিউম্যান ভ্যারিয়োম প্রজেক্টের মতে, বিশ্বের ৭ শতাংশেরও বেশি মানুষ হিমোগ্লোবিনের কোনো না কোনো ভ্যারিয়েন্ট বহন করে, যা এই ধরনের রোগের বৈশ্বিক বিস্তারের চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
ড. লিউ এবং ড. হুয়াং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তাদের পরীক্ষা পরিচালনা করেছেন। তারা ১০০ গুণেরও বেশি গভীরতার WES বিশ্লেষণ এবং GATK-এর মাধ্যমে ভ্যারিয়েন্ট কলিং সম্পন্ন করেন, যা পরবর্তীতে স্যাঙ্গার সিকোয়েন্সিং দ্বারা নিশ্চিত করা হয়। তাদের পরীক্ষায় JAK2 V617F বা PV-এর অন্য কোনো মার্কার পাওয়া যায়নি। এই কঠোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি আধুনিক হেমাটোলজিতে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে এবং নির্ভুল রোগ নির্ণয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।
এটি কেবল একজন রোগীর গল্প নয়, বরং সারা বিশ্বের হেমাটোলজিস্টদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ব্রিটিশ সোসাইটি ফর হেমাটোলজি এবং ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন ইন হেমাটোলজি এখন ব্যাখ্যাতীত এরিথ্রোসাইটোসিসের ক্ষেত্রে জিনোমিক পরীক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে। ট্রায়ো-ডব্লিউইএস পদ্ধতিটি রোগ নির্ণয়ের দীর্ঘসূত্রতাকে কয়েক মাস থেকে কমিয়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহে নিয়ে আসে। যেখানে বারবার বায়োপসি বা ভুল চিকিৎসায় প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়, সেখানে প্রায় ১,০০০ ডলারের এই পরীক্ষাটি অনেক বেশি সাশ্রয়ী এবং নির্ভুল ফলাফল প্রদান করে।
গবেষণার শেষে লেখকগণ মন্তব্য করেছেন যে, ট্রায়ো-ভিত্তিক ডব্লিউইএস উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জটিল হিমোগ্লোবিন ব্যাধিগুলোকে আলাদা করতে সক্ষম, যা সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করে। বিশেষ করে বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এটি হেমাটোলজি বিভাগে আমূল পরিবর্তন আনছে। ভবিষ্যতে যদি মাইক্রোসাইটিক এরিথ্রোসাইটোসিস কোনো চিকিৎসককে বিভ্রান্তিতে ফেলে, তবে ট্রায়ো সিকোয়েন্সিং হতে পারে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সমাধান। সঠিক রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে রোগীর জীবন রক্ষা করা এবং অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা এড়ানোই এখন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য।


