২০২৬ সালের ৩০শে জানুয়ারি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মস্কোতে শান্তি আলোচনা আয়োজনের প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং এর পরিবর্তে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে কিয়েভে আসার জন্য প্রকাশ্যে আমন্ত্রণ জানান। এই কূটনৈতিক পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে এলো যখন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে ক্রমাগত হামলা ইউক্রেনের জাতীয় গ্রিডকে দুর্বল করে দিচ্ছিল এবং গুরুতর পারমাণবিক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছিল। এই পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর বোর্ড অফ গভর্নরস ভিয়েনায় এক জরুরি অধিবেশনে মিলিত হয় ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি মস্কোতে বৈঠক করা 'অসম্ভব' বলে উল্লেখ করেন, কারণ রাশিয়াকে তিনি আগ্রাসনকারী রাষ্ট্র এবং বেলারুশকে এই কার্যকলাপের সহযোগী হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যদি কোনো প্রকৃত আলোচনা সম্ভব হয়, তবে তিনি যেকোনো বিন্যাসে শীর্ষ নেতাদের সম্মেলন আয়োজনে প্রস্তুত। এই বক্তব্যটি আবুধাবিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-মধ্যস্থতাকৃত ত্রিপক্ষীয় আলোচনার প্রথম পর্বের (জানুয়ারি ২৩-২৪, ২০২৬) সমাপ্তির পরে আসে, যা কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়েছিল। জেলেনস্কি আরও নিশ্চিত করেন যে, ইউক্রেন শক্তি কেন্দ্রে হামলার ক্ষেত্রে পারস্পরিক নীতির ওপর স্থির থাকবে: যদি রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি সাইটগুলিতে আঘাত করা বন্ধ করে, তবে ইউক্রেনও রাশিয়ার সাইটগুলিতে পাল্টা আঘাত করা থেকে বিরত থাকবে।
পারমাণবিক নিরাপত্তার বিষয়টি এই সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ রাশিয়ার হামলা ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। IAEA মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি ভিয়েনায় স্পষ্ট করে জানান যে, বিদ্যুৎ সাবস্টেশনগুলির ক্ষতি 'পারমাণবিক নিরাপত্তাকে ক্ষুণ্ণ করে এবং তা অবশ্যই এড়াতে হবে'। গ্রোসি উল্লেখ করেন যে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির শীতলীকরণ ব্যবস্থার জন্য নির্ভরযোগ্য অফ-সাইট বিদ্যুতের সরবরাহ অপরিহার্য, যা IAEA-এর 'সেভেন পিলার্স' নির্দেশিকার চতুর্থ স্তম্ভ। এই উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে, IAEA একটি বিশেষজ্ঞ মিশন শুরু করে ইউক্রেনের দশটি গুরুত্বপূর্ণ সাবস্টেশন মূল্যায়নের জন্য, যার অবস্থা সেপ্টেম্বর ২০২০ সালের পর থেকে সবচেয়ে খারাপ বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে ধর্মঘট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার বিষয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক বিরতি নিয়েও সংশয় ছিল। জেলেনস্কি এটিকে 'চুক্তি'র পরিবর্তে একটি 'সুযোগ' হিসেবে দেখলেও, তিনি নিশ্চিত করেন যে, যদি রাশিয়া এই বিরতি মেনে চলে, তবে ইউক্রেনও পারস্পরিকভাবে রাশিয়ার জ্বালানি সাইটগুলিতে আঘাত করা থেকে বিরত থাকবে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এই সাময়িক স্থগিতাদেশ কেবল কিয়েভের জন্য এবং শীঘ্রই শেষ হতে পারে।
ইউক্রেনীয় জনগণের মানসিকতা এই চাপের মুখেও দৃঢ় রয়েছে বলে সমাজতাত্ত্বিক তথ্য নির্দেশ করে। কিয়েভ আন্তর্জাতিক সমাজবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (KIIS)-এর জানুয়ারি ৯-১৪, ২০২৬ সালের একটি জরিপে দেখা যায় যে, ৬৯% ইউক্রেনীয় বিশ্বাস করেন যে বর্তমান আলোচনা স্থায়ী শান্তি আনবে না, কারণ রাশিয়া শান্তি চায় না। এছাড়াও, একই জরিপে দেখা গেছে যে ৭৭% ইউক্রেনীয় মনে করেন যে রাশিয়া অগ্রসর হলেও ইউক্রেন কার্যকর প্রতিরোধ বজায় রাখতে সক্ষম। আরও সাম্প্রতিক একটি জরিপ (জানুয়ারি ২৩-২৯, ২০২৬) অনুযায়ী, ৬৫% ইউক্রেনীয় প্রয়োজনে যতদিন প্রয়োজন ততদিন যুদ্ধ সহ্য করতে প্রস্তুত, যা ডিসেম্বর ২০২০-এর ৬২% থেকে সামান্য বেশি। এই দৃঢ়তা সত্ত্বেও, ৫২% ইউক্রেনীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে ডনবাস অঞ্চল রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাবকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
জানুয়ারি ২৩-২৯, ২০২৬ সালের KIIS জরিপে দেখা যায়, ৬১% ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে বিশ্বাস করেন, যেখানে ৩৩% অবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন, যা মধ্য জানুয়ারির তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত। তবে, একটি পরীক্ষামূলক পদ্ধতিতে এই আস্থা কমে ৫৩% এ দাঁড়ায়, যা কিছু নাগরিকের 'রাষ্ট্র-ভিত্তিক' অবস্থানকে নির্দেশ করে। এই পরিস্থিতিতে, ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং প্রেসিডেন্টের প্রতি জনগণের আস্থা মস্কোর চাপ সৃষ্টির কৌশলকে ব্যর্থ প্রমাণ করছে, যেখানে সামরিক চাপ সত্ত্বেও রাজনৈতিক ছাড় দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না।


