উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি ও নিষেধাজ্ঞার আবহে ইরানি তরুণদের অর্থনৈতিক সংগ্রাম: কাঠামোগত সংকটে জর্জরিত জীবনযাত্রা

সম্পাদনা করেছেন: user3@asd.asd user3@asd.asd

উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি ও নিষেধাজ্ঞার আবহে ইরানি তরুণদের অর্থনৈতিক সংগ্রাম: কাঠামোগত সংকটে জর্জরিত জীবনযাত্রা

ইরানের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত জেনারেশন জি, বর্তমানে এক কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন। আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিষেধাজ্ঞার সম্মিলিত প্রভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে পড়েছে। এই অর্থনৈতিক চাপ এতটাই তীব্র যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম প্রায় প্রতিদিনই পরিবর্তিত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে তলানিতে ঠেকিয়েছে।

এলনাজ এবং বিতার মতো অনেক তরুণ জানাচ্ছেন যে, মাংস, মাছ বা চালের মতো মৌলিক খাদ্যদ্রব্যও এখন মাসিক বেতনের ওপর নির্ভর করে মাস জুড়ে ভাগ করে খেতে হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক দুর্দশা এতটাই প্রকট যে, কেউ কেউ পোষা প্রাণীর দেখভাল করার সামর্থ্য হারিয়ে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। জুন মাসে ইসরায়েলের সাথে হওয়া সংঘাতের পরপরই মূল্যবৃদ্ধি আরও তীব্র হয় এবং জনগণের মধ্যে এক গভীর ভীতি সঞ্চারিত হয়। সরকারিভাবে বেকারত্বের হার ৭.৬% বলা হলেও, তরুণদের মধ্যে এই হার প্রায় প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন, যা শ্রমবাজারের গভীর সমস্যাকে নির্দেশ করে। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, কর্মসংস্থান থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৮০% ইরানি পরিবার বিশ্ব দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবনযাপন করছে।

অর্থনীতিবিদ হোসেইন রাগফার-এর মতে, এই সংকট মূলত কাঠামোগত বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার ফল। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, গাড়ির দামের মতো পণ্যের দাম এক মাসে ৬০-৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও সাধারণ বেতনভুক্ত কর্মীরা মুদ্রাস্ফীতির সাথে তাল মেলাতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে তরুণদের স্বপ্নগুলো যেন থমকে গেছে। বিতা বলছেন, দ্বৈত আয় সত্ত্বেও মৌলিক চাহিদা মেটানো কঠিন, ফলে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাগুলো এখন কেবল স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রার্থনায় পরিণত হয়েছে। আমিন নামে আরেকজন তরুণ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাইরের হুমকি দিয়ে জনগণকে একত্রিত করার যে পুরোনো ধারণা, তা এখন আর কার্যকর নয়, এবং নতুন কোনো সংঘাতে শাসকগোষ্ঠীকেই দায়ী করা হবে।

বহু বছর ধরে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে অনেকেই দেশ ছেড়েছেন। যারা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, তারা সেখানে স্বাধীনতা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেখছেন, যা দেশে কল্পনা করাও কঠিন। তবুও, অনেকেই আশা রাখেন যে পরিস্থিতি বদলালে তারা স্বদেশকে পুনর্গঠনে ফিরে আসবেন। তবে, বর্তমান হতাশা এতটাই গভীর যে, আমিনের মতো কেউ কেউ যুদ্ধের চেয়ে মৃত্যুকেও মুক্তির পথ হিসেবে দেখছেন।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশটির অভ্যন্তরেও ফাটল দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ইরানের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক আয়ানদেহ ব্যাংককে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সাথে একীভূত করা হয়েছে, যা আর্থিক খাতের গভীর সংকটকে সামনে এনেছে। এই ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও হ্রাস করে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায়। এই কঠিন পরিস্থিতিতে, যেখানে অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেখানে নিজেদের ভেতরের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই পরিস্থিতিকে উপলব্ধির একটি নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখা প্রয়োজন। বাইরের পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, নিজেদের ভেতরের স্থিরতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই পরিবর্তনের বীজ রোপণ করা সম্ভব, যা এই প্রজন্মের জন্য এক নতুন পথের সন্ধান দিতে পারে।

14 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Deutsche Welle

  • Al Jazeera

  • BBC News

  • Reuters

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।