প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা বিধু বিনোদ চোপড়া, যিনি 'থ্রি ইডিয়টস'-এর মতো সফল চলচ্চিত্রের জন্য পরিচিত, গোয়াতে অনুষ্ঠিত ৫৬তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (IFFI) এক মাস্টারক্লাসে সোশ্যাল মিডিয়া প্রভাবশালীদের (ইনফ্লুয়েন্সার) সংস্কৃতিকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। এই উৎসবটি ২০ থেকে ২৮ নভেম্বর, ২০২৫ পর্যন্ত গোয়ার পানাজি-তে আয়োজিত হয়েছিল। চোপড়া তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান বিনোদন জগতে প্রকৃত সৃজনশীলতা ও দক্ষতার চেয়ে অনলাইন জনপ্রিয়তা অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে, যা চলচ্চিত্র মাধ্যমকেও প্রভাবিত করছে।
চোপড়া ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন যে কীভাবে কিছু ব্যক্তি কেবল বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন করে লক্ষ লক্ষ অনুসারী অর্জন করছেন এবং ব্র্যান্ডগুলি সেই প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তাদের পণ্য প্রচার করছে, যা তাদের একটি কৃত্রিম গুরুত্ব প্রদান করছে। তিনি সরাসরি মন্তব্য করেন, "এই লোকেরা ইন্টারনেটে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে দাঁড়ায়... কারো ৫ মিলিয়ন ফলোয়ার, কারো ১০ মিলিয়ন, অন্য কারো ২০ মিলিয়ন" এবং ব্র্যান্ডগুলি তাদের পণ্য বিক্রির জন্য তাদের কাছে যায়। নির্মাতা আরও বলেন, "প্রভাবশালী মনে করে যে সে একজন কিংবদন্তি। আর তারপর ব্র্যান্ডগুলি সেই ব্যক্তির কাছে গিয়ে বলে, 'দয়া করে আমাদের পণ্যটি বিক্রি করুন'"। তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি সেই প্রবণতার নিন্দা করেন যেখানে ক্ষণস্থায়ী ডিজিটাল খ্যাতিকে প্রকৃত মেধার উপরে স্থান দেওয়া হচ্ছে।
বিধু বিনোদ চোপড়ার এই মন্তব্যগুলি তাৎক্ষণিকভাবে অনলাইনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাঁর সমালোচনার পক্ষে অনেকে তাঁর সততার প্রশংসা করেন এবং বলেন যে বর্তমান যুগে এই ধরনের সমালোচনা জরুরি, যেখানে ডিজিটাল প্রভাব কাস্টিং এবং সৃজনশীল সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। অন্যদিকে, অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর এর বিরোধিতা করে যুক্তি দেন যে একটি অনলাইন উপস্থিতি তৈরি করতে যথেষ্ট প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এই বিতর্কটি বিনোদন জগতে পরিবর্তিত গতিশীলতাকে তুলে ধরে, যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া মেট্রিক্স ক্রমশ কাস্টিং সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
এই মাস্টারক্লাস, যার শিরোনাম ছিল 'আনস্ক্রিপ্টেড: দ্য আর্ট অ্যান্ড ইমোশন অফ ফিল্মমেকিং', সেখানে চোপড়া তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের দর্শন নিয়েও আলোচনা করেন। তিনি তাঁর সাম্প্রতিক জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র '১২তম ফেল'-এর অনুপ্রেরণা হিসেবে সমাজের দুর্নীতিকে তুলে ধরেন এবং বলেন যে তাঁর চলচ্চিত্রগুলি সর্বদা তাঁর সময়ের প্রতিফলন। তিনি উল্লেখ করেন যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতির স্তরে ক্লান্ত এবং তাঁর কাজ সমাজের প্রতি তাঁর প্রতিক্রিয়া। তাঁর মতে, একজন শিল্পীর কাজ হলো তিনি যা অনুভব করছেন তা তাঁর কাজে প্রতিফলিত করা, যেমন শেক্সপিয়ার বা ভ্যান গগের ক্ষেত্রে হয়েছিল।
চোপড়া তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়া নিয়েও কথা বলেন, যেখানে তিনি স্ক্রিপ্ট লেখার জন্য কাগজ-পেন্সিল ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেন, যা বর্তমানের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম-কেন্দ্রিক প্রবণতার বিপরীত। তিনি স্মরণ করেন যে তাঁর ক্লাসিক চলচ্চিত্র '১৯৪২: আ লাভ স্টোরি'-এর একটি দৃশ্যের জন্য সিজিআই (CGI) ব্যবহার না করে আসল পাখি আনার জন্য ক্রু সদস্যরা পাহাড়ে রুটির গুঁড়ো ছড়িয়েছিলেন, যা তাঁকে আজও আনন্দ দেয়। তাঁর এই বক্তব্যগুলি চলচ্চিত্র শিল্পে সৃজনশীল সততা এবং বাণিজ্যিক সাফল্যের মধ্যেকার টানাপোড়েনকে আরও একবার সামনে নিয়ে আসে।
প্রসঙ্গক্রমে, আইএফএফআই ২০২৫-এর থিম ছিল 'সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তির সঙ্গম' (Convergence of Creativity and Technology)। অন্যদিকে, ভারতে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং শিল্প দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ২০২৪ সালে ₹৩,৬০০ কোটিতে পৌঁছেছে এবং ২০২৫ সালে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে। এই বৃদ্ধির মধ্যেও, বিজ্ঞাপন মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ASCI) জানিয়েছে যে অনেক প্রভাবশালী স্বচ্ছতার অভাব দেখায় এবং ব্র্যান্ড অংশীদারিত্ব সঠিকভাবে প্রকাশ করে না। ভোক্তা সুরক্ষা আইন ও নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও, স্বচ্ছতার অভাব এবং মিথ্যা দাবির কারণে আইনি ঝুঁকি বিদ্যমান, যা শিল্পে নৈতিকতার প্রশ্ন উত্থাপন করে। চোপড়ার মন্তব্যগুলি এই চলমান নৈতিক বিতর্কের একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে শিল্পীরা তাদের প্ল্যাটফর্মের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।



