ইরানে গভীর অর্থনৈতিক সংকট ও নিষেধাজ্ঞার কবলে পিষ্ট তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন

লেখক: max four

ইরানের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে 'জেনারেশন জেড', বর্তমানে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের চরম অভাব তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। গত জুন মাসে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের সংঘাত এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে এই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতা দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে।

এলনাজ এবং বিতার মতো সাধারণ ইরানি তরুণীদের কাছে প্রতিদিনের জীবন মানেই হলো নিত্যপণ্যের দামের অস্থিরতার সাথে লড়াই করা। তাদের ভাষায়, জীবনযাত্রার ব্যয় এখন 'অকল্পনীয়' পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং প্রতিদিন তা পরিবর্তিত হচ্ছে। জুনের সংঘাতের পরপরই বাজারে পণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যায় এবং মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়ে এসেছে। অনেক পরিবার এখন মাংস, মাছ এবং চালের মতো মৌলিক খাদ্যদ্রব্য রেশনিং করতে বাধ্য হচ্ছে। এমনকি আর্থিক সংকটের কারণে অনেকে তাদের প্রিয় পোষা প্রাণীটিকেও ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ তাদের লালন-পালন করার মতো সামর্থ্য আর অবশিষ্ট নেই।

পরিসংখ্যানগত তথ্যগুলো এই সংকটের ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। ১৪০৩ ইরানি ক্যালেন্ডার বছর (যা ২০ মার্চ, ২০২৪ থেকে শুরু হয়েছে) অনুযায়ী জাতীয় বেকারত্বের হার ৭.৬% বলা হলেও, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এই হার উদ্বেগজনকভাবে ২০.১%। যদিও কিছু তথ্যে বলা হয়েছে যে প্রায় ৮০% পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, ২০২৪ সালের অন্য একটি তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৪০% মানুষ এই সীমার নিচে রয়েছে। ২০১৮ সালের নিষেধাজ্ঞার পর থেকে এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। আইএমএফ-এর হিসাব অনুযায়ী ২০২০ সাল থেকে মুদ্রাস্ফীতির গড় হার ৪২% এর উপরে রয়েছে এবং ২০১৮ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপের পর থেকে ইরানি রিয়ালের মান ৯০% এর বেশি কমে গেছে।

এই অর্থনৈতিক ধস তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। এলনাজ তার আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে, তিনি শুধু চান মুদ্রাস্ফীতি থামুক যাতে তিনি অন্তত একটি গ্রীষ্মকালীন ছুটির পরিকল্পনা করতে পারেন। বিদেশের আত্মীয়দের সাথে পুনরায় যোগাযোগ করার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি তাকে হতাশ করে। অন্যদিকে, বিতা তার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কমিয়ে এখন কেবল স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বপ্ন দেখছেন। আমিন নামের এক তরুণ জানান, তরুণদের মধ্যে এক ধরনের নীরব ক্ষোভ বিরাজ করছে। ভবিষ্যতের কোনো দিশা না পেয়ে অনেকে এমনকি স্থবির জীবনের চেয়ে সংঘাত বা মৃত্যুকেও শ্রেয় মনে করছেন। আমিনের মতে, ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত শুরু হলে সাধারণ মানুষ আর বর্তমান ব্যবস্থার পাশে দাঁড়াবে না।

এই অর্থনৈতিক ক্ষয় মূলত বছরের পর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতারই একটি বহিঃপ্রকাশ, যা ইতিমধ্যে দেশটিতে ব্যাপক অভিবাসনের জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষের হাহাকার আর প্রভাবশালী অভিজাত শ্রেণির বিলাসবহুল জীবনের মধ্যে ব্যবধান এখন আকাশচুম্বী। একদিকে যখন মাংস ও চালের মতো নিত্যপণ্যের দাম বছরে ৫১% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এই 'নিষেধাজ্ঞার অর্থনীতি' থেকে মুনাফা লুটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি এখন রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তনের চেয়ে প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াইয়ে বেশি ব্যস্ত। এই প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এখন এক অনিশ্চিত মেঘে ঢাকা, যেখানে সাধারণ মানুষের ভয় যে কোনো নতুন সংঘাত ইরানকে দেউলিয়া করে দিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, ইরানের এই বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং এটি একটি সামাজিক কাঠামোর ভাঙন। তরুণরা যখন দেখে যে তাদের কঠোর পরিশ্রমের কোনো মূল্য নেই এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন তাদের সঞ্চয়কে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে দেশ ছাড়ার প্রবণতা আরও প্রবল হয়। শিক্ষা এবং মেধা থাকা সত্ত্বেও তারা যখন শ্রমবাজারে নিজেদের স্থান করে নিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই হতাশা পুরো জাতির মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দেয়। এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের পথ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন এবং দীর্ঘ বলে মনে হচ্ছে।

7 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
ইরানে গভীর অর্থনৈতিক সংকট ও নিষেধাজ্ঞার কব... | Gaya One