প্রায় তিন শতাব্দী পর, মাদাগাস্কারের উপকূলে নোসি বোরাহা দ্বীপের কাছে ১৭২১ সালে জলদস্যুদের আক্রমণে ধ্বংস হওয়া পর্তুগিজ যুদ্ধজাহাজ 'নোসা সেনহোরা দে কাবো'-এর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। এই আবিষ্কারটি স্বর্ণযুগের জলদস্যুতা, বাণিজ্য এবং ধর্মীয় পটভূমি বোঝার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
১৭২১ সালের ৮ এপ্রিল, ভারত থেকে লিসবনগামী এই ৭০০ টনের জাহাজটি জলদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। জলদস্যুদের মধ্যে অন্যতম ছিল অলিভিয়ের লেভাসেউর (লা বুজ) এবং জন টেলর। জাহাজটি তখন ঝড়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং সমুদ্রে টিকে থাকার জন্য এর অনেক কামান সমুদ্রে ফেলে দিতে হয়েছিল। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জলদস্যুরা জাহাজটি দখল করে নেয়।
জাহাজটিতে সোনা, রূপা, মুদ্রা, রেশম এবং বিভিন্ন মূল্যবান রত্নপাথর সহ বিপুল পরিমাণ সম্পদ ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এই সম্পদের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ছিল ১১০টি হীরা, ২৫০টি পান্না, ২০টি রুবি এবং ২০টি স্যাফায়ার। এছাড়াও, জাহাজটিতে পর্তুগিজ গোয়া থেকে আনা ধর্মীয় সামগ্রীও ছিল, যা লিসবনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
এই আবিষ্কারটি কেবল ঐতিহাসিক মূল্যই বহন করে না, বরং জলদস্যুদের জীবনযাত্রা এবং সেই সময়ের বাণিজ্য পথের উপর তাদের প্রভাব সম্পর্কেও আলোকপাত করে। জলদস্যুদের কার্যকলাপের কারণে অনেক সময় বাণিজ্য পথ পরিবর্তন করতে হত, যা দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যাত্রা তৈরি করত। 'নোসা সেনহোরা দে কাবো'-এর মতো জাহাজের ধ্বংসাবশেষ সেই সময়ের ঝুঁকি এবং বাণিজ্যের উপর জলদস্যুদের প্রভাবের একটি জীবন্ত প্রমাণ।
জাহাজটি জলদস্যুদের দ্বারা দখল হওয়ার পর, এটিকে মাদাগাস্কারের কাছেই অবস্থিত সেন্ট মেরি দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে এটিকে 'ভিক্টোরিউক্স' নামে পুনঃনামকরণ করা হয়। পরবর্তীতে, জলদস্যুদের মধ্যে বিবাদের জেরে জাহাজটি সেখানেই ডুবিয়ে দেওয়া হয়। যদিও জলদস্যুরা কিছু সম্পদ পর্তুগিজদের কাছে মুক্তিপণ হিসেবে ফিরিয়ে দিয়েছিল, তবে বেশিরভাগ ধনসম্পদ সমুদ্রের গভীরে হারিয়ে যায়।
এই আবিষ্কারটি প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ইতিহাসবিদদের জন্য এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। এটি জলদস্যুদের স্বর্ণযুগ, সেই সময়ের সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং ঔপনিবেশিকতার জটিল চিত্র বুঝতে সাহায্য করবে। প্রায় দুই দশক ধরে চলা গবেষণা এবং খননকার্যের পর এই ধ্বংসাবশেষ সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই আবিষ্কারটি কেবল একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষই নয়, বরং এটি অতীতের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী, যা আমাদের সেই সময়ের দুঃসাহসিক এবং বিপজ্জনক জীবনের এক ঝলক দেখায়।