এমআইটি বিজ্ঞানীদের যুগান্তকারী আবিষ্কার: পি-ওয়েভ ম্যাগনেটিজম এবং ভবিষ্যতের ইলেকট্রনিক্স

লেখক: Change1 Change2

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি)-র একদল গবেষক সম্প্রতি বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তারা দ্বিমাত্রিক নিকেল আয়োডাইড ক্রিস্টালের মধ্যে 'পি-ওয়েভ ম্যাগনেটিজম' (p-wave magnetism) নামক একটি বিরল এবং নতুন চৌম্বকীয় অবস্থার পরীক্ষামূলক প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন। এই চাঞ্চল্যকর গবেষণাটি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার কমিউনিকেশনস'-এ (Nature Communications) প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কারটি আমাদের বর্তমান ডেটা স্টোরেজ এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম। এর ফলে ভবিষ্যতে এমন সব ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরি করা সম্ভব হবে যা বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হবে, যা আধুনিক প্রযুক্তির সংজ্ঞাই বদলে দিতে পারে।

পি-ওয়েভ ম্যাগনেটিজম হলো একটি অত্যন্ত জটিল এবং অনন্য হাইব্রিড অবস্থা, যা মূলত ফেরোম্যাগনেটিজম এবং অ্যান্টিফেরোম্যাগনেটিজমের সংমিশ্রণে গঠিত। এই বিশেষ অবস্থায় ইলেকট্রন স্পিনগুলো একটি নির্দিষ্ট সর্পিল বা স্পাইরাল বিন্যাস ধারণ করে। এই বিন্যাসটি কাইরাল প্যাটার্ন তৈরি করে, যা একে অপরের দর্পণ প্রতিবিম্বের মতো দেখায়। এই ধরনের কাঠামোর একটি বিশেষত্ব হলো, এটি কোনো নিট বাহ্যিক চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে না। তবে বাহ্যিক চৌম্বক ক্ষেত্র না থাকলেও, এই অবস্থাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বৈদ্যুতিক সিগন্যালের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যা বিজ্ঞানীদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

এই গবেষণায় এমআইটি-র গবেষক দলটি ইউনিভার্সিটি অফ মিলান-বিকোকা-র (University of Milan-Bicocca) অধ্যাপক সিলভিয়া পিকোজি-র (Professor Silvia Picozzi) সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। তারা যৌথভাবে প্রদর্শন করেছেন যে, একটি সামান্য বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র ব্যবহার করে এই স্পিন স্পাইরালগুলোর দিক বা 'হ্যান্ডেডনেস' কার্যকরভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব। স্পিনের এই বৈদ্যুতিক সুইচিং ক্ষমতা 'স্পিনট্রোনিক্স' (spintronics) নামক উদীয়মান প্রযুক্তির জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্পিনট্রোনিক্স মূলত ইলেকট্রনের চার্জের পরিবর্তে তাদের স্পিনকে ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াকরণ করে থাকে, যা প্রচলিত ইলেকট্রনিক্সের একটি শক্তিশালী বিকল্প।

প্রথাগত ইলেকট্রনিক্স যেখানে ইলেকট্রনের প্রবাহ বা চার্জের ওপর নির্ভর করে, সেখানে স্পিনট্রোনিক্স একটি অনেক বেশি দক্ষ এবং টেকসই বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। এই নতুন প্রযুক্তির ফলে শক্তি সাশ্রয়ের পরিমাণ হবে অভাবনীয়। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানের প্রচলিত প্রযুক্তির তুলনায় এটি প্রায় পাঁচ মাত্রার মান (ফাইভ অর্ডারস অফ ম্যাগনিটিউড) পর্যন্ত শক্তি খরচ কমাতে সক্ষম। চুম্বকত্বের ইতিহাসে এতদিন ফেরোম্যাগনেটিজম এবং অ্যান্টিফেরোম্যাগনেটিজমই ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়। কিন্তু পি-ওয়েভ ম্যাগনেটিজমের এই আবিষ্কার তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক পুরনো ধারণাকে বাস্তবে রূপদান করেছে এবং বিজ্ঞানের এই শাখায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা গবেষকদের জন্য গবেষণার নতুন পথ খুলে দিয়েছে।

এই যুগান্তকারী পরীক্ষার সফল সমাপ্তির জন্য গবেষকরা অত্যন্ত সূক্ষ্ম নিকেল আয়োডাইড ফ্লেক্স তৈরি করেছিলেন। তারা এই অতি-পাতলা স্তরের ওপর বৃত্তাকার মেরুকৃত আলো (circularly polarized light) প্রয়োগ করেন। পরীক্ষার সময় দেখা যায় যে, ইলেকট্রন স্পিনগুলোর বিন্যাস আলোর দিক বা হ্যান্ডেডনেসের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। এই বিশেষ সংকেতটিই পি-ওয়েভ ম্যাগনেটিজমের উপস্থিতিকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে। এই আবিষ্কারটি কেবল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত স্মার্টফোন থেকে শুরু করে সুপারকম্পিউটার পর্যন্ত প্রতিটি ডিভাইসের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

16 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।